দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ভারতীয় সেনাবাহিনীর অভিযানে কাশ্মীরে নিহত হয়েছেন বলে যে দাবি করা হয়েছিল, সেই সাবেক পাকিস্তানি সেনাসদস্য মুহাম্মদ আসিফকে জীবিত অবস্থায় গণমাধ্যমের সামনে হাজির করেছে পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)।
বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে আইএসপিআরের মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী তাকে সামনে এনে ভারতের ওই দাবিকে মিথ্যা বলে অভিহিত করেন।
আইএসপিআর মহাপরিচালক বলেন, গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে ভারতের একটি সেনা সূত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানায়, কোরাগ, ইউসমার্গ এলাকায় যৌথ তল্লাশি অভিযান চালানো হয়েছে। ওই অভিযানে একজন ‘সন্ত্রাসী’ নিহত হয়েছে বলেও জানানো হয়।
এর প্রায় সাত ঘণ্টা পর ভারতীয় সেনাবাহিনী আরেকটি বিবৃতিতে জানায়, পালমাইদান এলাকায় অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামসহ লস্কর-ই-তৈয়বার এক সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত ব্যক্তির নাম মোহাম্মদ আসিফ, যিনি হাশিম মুসা নামেও পরিচিত বলে দাবি করা হয়।
এরপর ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইয়ের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, মোহাম্মদ আসিফ ১৯৮০ সালের ৭ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। ২০০০ সালে তিনি পিএ-৩১০৬৯৪৭ নম্বর নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং হাবিলদার পদে অবসর নেন। ২০০৫ সালে তিনি স্পেশাল সার্ভিসেস গ্রুপে (এসএসজি) যোগ দেন এবং ৪ কমান্ডো ইয়ালগার ব্যাটালিয়নে দায়িত্ব পালন করেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এএনআইয়ের ওই প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, ২০০৬ সাল থেকে বেলুচিস্তানে দায়িত্ব পালনকালে আসিফ প্রায় ১০টি অভিযানে অংশ নেন, ১৩ জনকে হত্যার কৃতিত্ব তার রয়েছে এবং ২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফের ভিভিআইপি নিরাপত্তা দলেও দায়িত্ব পালন করেন।
সংবাদ সম্মেলনে আইএসপিআর মহাপরিচালক বলেন, ‘উরি, পাহেলগাম ও পুলওয়ামার কথা হয়তো মনে আছে। খুবই চমকপ্রদ একটি গল্প তৈরি করা হচ্ছে এবং এখন সেই গল্প সম্পূর্ণ হয়েছে।’
এরপর তিনি মুহাম্মদ আসিফকে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করেন। আসিফ নিজেও জানান, তিনি জীবিত এবং পাকিস্তানের পাঞ্জাবের আত্তক জেলার পিন্ডিঘেব তেহসিলের বাসিন্দা।
আসিফ বলেন, বুধবার সন্ধ্যায় বন্ধুরা ফোন করে তাকে জানান, ভারতীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর ছড়িয়েছে যে কাশ্মীরে অভিযানে ভারতীয় সেনাবাহিনী তাকে হত্যা করেছে। তিনি তাদের জানান, তিনি সুস্থ আছেন এবং বাড়িতে অবস্থান করছেন।
এরপর অজ্ঞাত ভারতীয় নম্বর থেকে তার কাছে একাধিক ফোন আসতে থাকে। ফোনকারীরা তার ব্যক্তিগত তথ্য জানতে চায় এবং খবরে উল্লেখ করা ব্যক্তির সঙ্গে তার সম্পর্ক আছে কি না, জানতে চায়। আসিফ জানান, তিনি বারবার নম্বরগুলো বন্ধ করে দেন। পরে টেলিভিশনে নিজের ছবি ও সামরিক জীবনের তথ্য দেখে তিনি বিস্মিত হন।
আসিফ বলেন, তিনি বিষয়টি পরিষ্কার করতে সাবেক ইউনিটের কর্মকর্তাদের জানান যে তিনি নিরাপদে বাড়িতে আছেন। পরে আইএসপিআর তার সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং তাকে প্রকাশ্যে বিষয়টি জানাতে অনুরোধ করে।
নিজের সামরিক জীবনের বিষয়ে আসিফ জানান, ২০০০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আর্টিলারি কোরে যোগ দেন তিনি। ২০০৫ সালে এসএসজিতে যোগ দেন। ১৮ বছর দায়িত্ব পালনের পর ২০২৩ সালে অবসর নেন। অবসরের পর তিন বছর একটি বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। গত কয়েক মাস ধরে পুরোপুরি অবসর নিয়ে বাড়িতে ছোট ব্যবসা করছেন বলেও জানান তিনি।
ভারতের পক্ষ থেকে তাকে আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে জড়িত হিসেবে যে অভিযোগ করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন আসিফ। নিজের পরিচয় নিশ্চিত করতে তার কাছে জাতীয় পরিচয়পত্র ও সামরিক পরিচয়পত্র রয়েছে বলেও জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে আইএসপিআর মহাপরিচালক আরও বলেন, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনায় ভারত বিভিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠনকে পৃষ্ঠপোষকতা করে। তিনি ভারতের বিরুদ্ধে ‘ফলস-ফ্ল্যাগ’ বা সাজানো ঘটনার মাধ্যমে পাকিস্তানকে দায়ী করার অভিযোগও করেন।
তিনি বলেন, ভারতের অভ্যন্তরীণ সমস্যা, দমন-পীড়ন ও নির্যাতনের দায় পাকিস্তানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ থাকলে তা প্রকাশ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পাকিস্তান এর আগে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে প্রমাণ যাচাইয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল।
আইএসপিআর মহাপরিচালক ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ঘটনাকে ‘এনকাউন্টার’ হিসেবে উপস্থাপনের সমালোচনা করেন। তার দাবি, প্রকৃত ঘটনা প্রতিষ্ঠার বদলে এসব ক্ষেত্রে পাকিস্তানি সংশ্লিষ্টতা ও এসএসজির প্রসঙ্গ সামনে এনে একটি নির্দিষ্ট বয়ান তৈরি করা হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়েও কথা বলেন তিনি। মক্কা জোটের আওতায় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাস্তবায়নে পাকিস্তান পুরোপুরি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানান। তবে এ-সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য গোপনীয় হওয়ায় গণমাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সৌদি আরবের পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে পাকিস্তানের অঙ্গীকার ‘পরম’ বলেও জানান আহমেদ শরীফ চৌধুরী। একই সঙ্গে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক সীমান্ত রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেন তিনি।
এ ছাড়া পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) লং মার্চ ও দলটির প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানকে নিয়ে প্রশ্ন করা হলে রাজনৈতিক বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান আইএসপিআর মহাপরিচালক। তিনি বলেন, রাজনীতি রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিবিদদের বিষয়। পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী সংবিধানের অধীন এবং রাষ্ট্রের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করে।
তিনি আরও বলেন, গত দুই দশক ধরে পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে এবং এ কারণে দেশটি বিশ্বের সন্ত্রাসবাদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। কোনো রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে আপস করা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
/অ